জানেন কি, অনলাইনে নিজেই কীভাবে আপনার কম্পিউটার কিংবা মোবাইল ফোনের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনছেন?

ইন্টারনেট এবং কম্পিউটার হলো বর্তমান বিশ্বের অন্যতম চালিকাশক্তি। এরকম অনেকেই আছেন যাদের দিনরাত আবর্তিত হয় কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের সাথে। তবে বাতির নিচেই থাকে অন্ধকার। তাই সব সময় সুবিধার পাশাপাশি কিছু সমস্যা এবং অসুবিধাও থাকে। আজকাল কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট জগতের কিছু সমস্যা নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। কিছু প্রতিকার এবং অধিকাংশ সময় নীরবে সহ্য করা এসব সমস্যা আমাদের অক্টোপাসের মতো চারপাশ থেকে আঁকড়ে ধরেছে। এখন মনে হয় সমস্যা প্রতিকারের চাইতে সমস্যা কোথায় থেকে শুরু হচ্ছে সেটা জানাটাই আমাদের জন্য অধিক জরুরী। কারন কোন সমস্যাকে নির্মূল করতে চাইলে তার মূল সহ উৎপাটন করতে হয়। আজকের টিউনটি আমি সাজিয়েছি এমন কিছু সমস্যা নিয়ে যেগুলোর মুখোমুখি আমরা প্রতিনিয়ত হলেও সেগুলোর কারন জানিনা। তবে টিউনটি শুরু করার পূর্বে আপনার ম্যালওয়্যার বিষয়ে পূর্ণ ধারনা থাকতে। যারা জানেন ম্যালওয়্যার কী এবং কীভাবে কাজ করে তাদের জন্য টিউনের পরবর্তি অংশ হলেও যারা জানেন না তাদের জন্য নিচের টিউনটি দেখে তারপর অগ্রসর হতে হবে।

আপনি কি জানেন ম্যালওয়্যার – ভাইরাস, স্প্যাইওয়্যার, এডওয়্যার, ট্রোজান এবং ওয়ার্ম কী? আলাদা আলাদা ভাবে এগুলো কীভাবে কাজ করে এবং কী ধরনের ক্ষতি করে? অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে আপনাকে এসব জানতেই হবে!!

ইমেইল স্প্যামিং – বিরক্তির অন্য নাম

ইমেইল একাউন্টে স্প্যাম যে কতোটা বিরক্তিকর সেটা যারা মেইল নিয়মিত ব্যবহার করেন তারা খুব ভালো করেই জানেন। যদিও আজকাল স্প্যাম মেইলগুলো স্প্যাম ফোল্ডারে জমা হয় তবুও এটা স্বস্তিদায়ক কিছু না। কিন্তু সমস্যাটা সেখানেই যখন আপনার কোন বন্ধু আপনাকে জানালো যে আপনার একাউন্ট থেকে স্প্যাম মেসেজ সেন্ড হচ্ছে। আপনি হয়তো ভাবছেন এটা কীভাবে সম্ভব? হুম, সবই সম্ভব কারন একটি অসতর্কতা অনেক বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। যদি আপনার বিষয়ে এরকম অভিযোগ আসে তাহলে বুঝতে হবে আপনার একাউন্ট ম্যালওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।



ম্যালওয়্যার বিষয়ে নিশ্চয় ইতিমধ্যে জেনে এসেছেন। এবার উল্লেখ করছি কীভাবে এরকম ম্যালওয়্যার দ্বারা আপনার পিসি আক্রান্ত হয়েছে। পিসিতে ম্যালওয়্যার প্রবেশ করা তেমন কঠিন কিছুনা, অনেক আনভেরিফাইড অ্যাপ্লিকেশন, ওয়েব পেইজ বা মেইল থেকে পিসি ম্যালওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এমন অবস্থায় আপনার কম্পিউটারের ব্রাউজারে যদি কোন পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করা থাকে তাহলে ম্যালওয়্যার সেই পাসওয়ার্ডে খুব সহজেই অ্যাক্সেস করতে পারে। এবং নিজের বংশবৃদ্ধির জন্য অন্যদেরকেও এভাবে আক্রান্ত করে চলে।

পাসওয়ার্ড পরিবর্তন হয়ে যাওয়া

আজকাল মেইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগ সাইটের একাউন্টগুলো হ্যাকিং প্রবণতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একারনে এসব আইডি সংরক্ষণ বিষয়ে আমরা একটু বেশিই সচেতন। এই সুযোগে কিছু হ্যাকার মাঝে মাঝে ইমেইলে ফলস মেইল পাঠিয়ে বলে যে আপনার একাউন্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন হয়েছে। ঠিক করতে চাইলে এই লিংকে ক্লিক করুন। আর ক্লিক করলেই আপনার সব শেষ। যদিও অনেক সময় পাসওয়ার্ড পরিবর্তন হলে ভেরিফাইড সাইট হতেও পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের মেইল আসে। এখন প্রশ্ন হলো, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন হবে কীভাবে?



টিউনের শুরুতে উল্লেখিত লিংক থেকে আপনারা নিশ্চয় ট্রোজান হর্স সম্পর্কে জেনে নিয়েছেন। ট্রোজান হর্স খুব মারাত্বক একটা ম্যালওয়্যার। সাধারনত অনেক আকর্ষণীয় জিনিসের মাঝে ট্রোজান হর্স লুকিয়ে থাকে। আপনি অনলাইন থেকে কোন জনপ্রিয় মুভি, গান কিংবা ছবি ডাউনলোড করলেন যার ভেতরে ট্রোজান হর্স আছে। এবার স্ক্যান না করেই যদি সেটাকে ওপেন করেন তাহলে সাথে সাথে আপনার পিসি ট্রোজান হর্স দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যাবে এবং আপনার যাবতীয় তথ্য হ্যাকারের কাছে পাঠিয়ে দিবে।

ফেইক এন্টিভাইরাস মেসেজ

কম্পিউটার কিংবা স্মার্টফোন এই দুটো ডিভাইসের জন্যই ফেইক এন্টিভাইরাস মেসেজ খুবই মারাত্বক একটি সমস্যা। মজার ব্যাপার হলো যারা তাদের প্রিয় ডিভাইসের নিরাপত্তা বিষয়ে একটু বেশি সচেতন তারাই এই সমস্যার কবলে পড়ে বেশি। আপনি যখন কোন ওয়েব সাইট ভিজিট করবেন তখন অনেক সময় একটি পপ-আপ উইন্ডো এসে বলে যে, আপনার পিসি ম্যালওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে অথবা স্লো কাজ করছে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ফ্রিতে পিসি স্ক্যান করুন। আর আপনি যদি সুবোধ মানুষের মতো স্ক্যান করেন তাহলে আপনার সব তথ্য তাদের কাছে চলে যাবে।



এছাড়াও বিভিন্ন সফটওয়্যারের আকর্ষনীয় অফার আপনাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এক্ষেত্রে সমাধান হলো পিসির জন্য ভালো একটি এন্টিভাইরাস প্রোগ্রাম ব্যবহার করা এবং পিসির সিকিউরিটি বিষয়ে যাবতীয় দুঃচিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলা। আর অ্যান্ড্রোয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য কথা হলো, আপনার ফোন যদি রুট করা না থাকে তাহলে সিকিউরিটির জন্য এতো ভাবতে হবে না। তবে রুটেড ফোনগুলোর সিকিউরিটি নিয়ে সামান্য দুঃচিন্তা থেকেই যায়। এক্ষেত্রে সেই একই সমাধান হলো ভালো একটি এন্টিভাইরাস প্রোগ্রাম।

ওয়েব সাইট পপ-আপ

আপনি ফেইসবুক ব্যবহার করতেছেন এমন সময় ব্রাউজারের নতুন একটি উইন্ডোজ ওপেন হয়ে গেলো অথবা একই ব্রাউজারে একটি পপ আপ মেসেজ আসলো যে আপনি একটি পুরষ্কার জিতেছেন। এবার খুশিতে যেই না ক্লিক করবেন অমনি যা হবার তা হয়ে যাবে। তবে কিছু হোক আর না হোক, শুধুমাত্র পপ আপ উইন্ডোগুলোই আমার কাছে বিরক্তির প্রধান কারন। এমন হলে শুধুমাত্র ব্রাউজার সেটিংস থেকে পপ-আপ উইন্ডোজ ডিজেবল করে দিতে পারেন।



তবে ওয়েব সাইট পপআপ মূলত একেকটি এডওয়্যার পপ আপ। অ্যাডওয়্যার কী সেই বিষয়ে নিশ্চয় এতোক্ষণে আইডিয়া নিয়ে নিয়েছেন। তবে ব্রাউজারের তথ্য হাইজ্যাক করার জন্য এরকম ওয়েব সাইট পপ আপের কোন বিকল্প নেই। কারন বুদ্ধিমানরা ধরা না খেলেও বোকারা ঠিকই ধরা খায়। আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, কোন এক সময় আমিও বোকাদের দলেই ছিলাম।

অনাকাঙ্খিত ব্রাউজার টুলবার

ব্রাউজার টুলবার সাধারনত কিছু ফ্রিওয়্যার ইনস্টলেশনের সময় কিংবা আনভেরিফাইড ডাউনলোডের সময়ে হয়ে থাকে। কারন আগে থেকেই ব্রাউজার টুলবার গুলো ইনস্টলেশনের জন্য চেকমার্ক করা থাকে। সেগুলো আনচেক না করলে দেখা যায় ব্রাউজারের সাথে সেগুলো সংযুক্ত হয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রে সেগুলো স্থায়ীভাবে রিমুভ করাও কষ্টকর হয়। এখন কথা হলো ব্রাউজারে টুলবার দিয়ে তো অনেক কাজ করা যায়, তাহলে এগুলো থাকলে সমস্যা কি?



এগুলোর প্রধান সমস্যা হলো এরা আপনার ওয়েব ব্রাউজিং এর উপর স্পাইগিরি করে। আপনার সব তথ্য হ্যাকারের কাছে পাঠাতে পারে। এছাড়াও এসব টুলবার আপনার কাঙ্খিত সাইটের পরিবর্তে অন্য সাইটে রিডাইরেক্ট করে। আপনার সার্চ ইঞ্জিন পরিবর্তন করে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার কাছে সব চেয়ে বিরক্তিকর লাগে Ask টুলবার। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যে এই টুলবার দ্বারা আক্রান্ত সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। কারন বাংলাদেশ থেকে বেশি ভিজিট দশটি সাইটের মধ্যে Ask সাইট অন্যতম। যেখানে আমাদের প্রাণপ্রিয় টেকটিউনসের কোন অবস্থান নেই।

উইন্ডোজ স্টার্ট হতে দীর্ঘ সময় নেওয়া

অনেক সময় দেখা যায় পিসি স্টার্ট হতে অনেক সময় নেয়। কিংবা চলমান পিসি খুব ধীরগতিতে কাজ করে। এগুলো আপনাদের কাছে সাধারন ঘটনা মনে হলেও এখন যা বলতে যাচ্ছি সেটা শুনলে আপনার পিলে চমকে যাবে। যখন পিসি স্লো কাজ করে তখন বুঝতে হবে যে আপনার পিসি ম্যালওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত এবং সেগুলো সিস্টেম ব্যাকগ্রাউন্ডে চলমান অবস্থায় আছে এবং ক্রমাগত বংশবৃদ্ধি এবং সার্ভারে তথ্য স্থানান্তরে ব্যস্ত। এসব ম্যালওয়্যার আপনার পিসির ইন্টারনেট এবং অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে তাই পিসির স্পিড কম মনে হয়।



এমন অবস্থায় পিসিকে পরিপূর্ণরূপে স্ক্যান করে নিতে হবে। অথবা পুনরাই উইন্ডোজ ইনস্টল করা যেতে পারে। আপনারা যারা পিসি দিয়ে অনেক একাউন্ট কন্ট্রোল করেন তাদের জন্য এরকম অবস্থা খুবই ক্ষতির কারন। অনেকেই এখন প্রশ্ন করতে পারেন যে অফলাইনে থাকলেও তো পিসি স্লো কাজ করে। এক্ষেত্রে উত্তর হলো, তথ্য পাচার হোক কিংবা না হোক, ম্যালওয়্যারগুলো তাদের প্রচেষ্টা সব সময় অব্যাহত রাখে।

কিছুক্ষণ পরপর ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া

যারা মোডেম কিংবা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করেন তাদের জন্য এটি একটি অতি পরিচিত সমস্যা। তবে এই সমস্যাটি দুটি কারনে হতে পারে। একটা হলো মোডেম কোম্পানি কিংবা ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP) এ সমস্যা। এবং অপরটা হলো পিসির নিজস্ব সমস্যা। আপনি যদি মনে করেন যে সার্ভিস প্রোভাইডারদের কোন সমস্যা নেই তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটা আপনার পিসিতে। এবং পিসি ম্যালওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত এবং আপনার পিসির ব্যান্ডউইথ অন্যকোথাও শেয়ার করা হচ্ছে।



তবে মাঝে মাঝে যদি এমন দেখেন যে আপনি কোন ওয়েব পেইজ ভালোভাবে ব্রাউজ করতে পারলেও বিভিন্ন ইন্টারনেট মেসেঞ্জার যেমন স্কাইপ ব্যবহার করতে পারছেন না তাহলে বুঝতে হবে হ্যাকার আপনার পিসিকে প্রক্সি হিসাবে ব্যবহার করতেছে। হ্যাকারগন তাদের সুবিধার জন্য এসব অনায়াসেই করতে পারে। সুতরাং আজই সময় হয়েছে পিসি ব্যবহারে আরও একটি সচেতন হওয়ার।

টিউন ক্রেডিট সানিম মাহবীর ফাহাদ


কমেন্ট করার জন্য ধন্যবাদ। Conversion Conversion Emoticon Emoticon